১৫০ বছরে "বন্দেমাতরম", ভারতের স্বাধীনতার কন্ঠস্বর
"বন্দে মাতরম" ভারতীয় জাতীয় আন্দোলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও প্রেরণাদায়ক গান, যা ভারতবাসীর মনে দেশপ্রেম ও স্বাধীনতার চেতনা জাগিয়ে তুলেছিল । এই গানটির রচয়িতা ছিলেন প্রখ্যাত সাহিত্যিক বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় । তিনি প্রথমে সংস্কৃত ও বাংলার মিশ্র ভাষায় এই গানটি রচনা করেন এবং এটি তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস আনন্দমঠ (প্রকাশিত ১৮৮২) -এর অন্তর্ভুক্ত ছিল । এই উপন্যাসে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে সন্ন্যাসী বিদ্রোহের পটভূমিতে “বন্দে মাতরম” গানটি মাতৃভূমিকে দেবীরূপে কল্পনা করে রচিত হয় ।
“বন্দে মাতরম” শব্দের অর্থ হলো “মাতৃভূমিকে প্রণাম” বা “মা, তোমায় বন্দনা করি” । এখানে ভারতবর্ষকে মাতারূপে চিত্রিত করা হয়েছে—যিনি শস্যশ্যামলা, সুজলা-সুফলা, শীতল বাতাসে ভরা এক সমৃদ্ধ ও পবিত্র ভূমি । এই গানটি শুধু একটি সাহিত্যকর্ম নয়, বরং স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় এটি এক শক্তিশালী স্লোগান হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল । ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী বিপ্লবীরা “বন্দে মাতরম” ধ্বনি দিয়ে নিজেদের উদ্দীপ্ত করতেন এবং এটি স্বাধীনতার প্রতীক হয়ে ওঠে ।
১৮৯৬ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রথমবারের মতো এই গানটি ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেস-এর অধিবেশনে গেয়ে শোনান, যার ফলে গানটি সারা দেশে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে । পরে বিভিন্ন স্বাধীনতা সংগ্রামী যেমন বিপিনচন্দ্র পাল, লালা লাজপত রায় প্রমুখ এই গানকে আন্দোলনের মূল অনুপ্রেরণা হিসেবে গ্রহণ করেন ।
স্বাধীনতার পর ১৯৫০ সালে ভারতের সংবিধান গ্রহণের সময় “বন্দে মাতরম”-কে জাতীয় গান (National Song) হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়, যদিও জন গণ মন জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে গৃহীত হয়। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো—“বন্দে মাতরম”-এর প্রথম দুটি স্তবককেই সাধারণত সরকারি ও আনুষ্ঠানিক ক্ষেত্রে গাওয়া হয় ।
তবে এই গানটি নিয়ে কিছু বিতর্কও রয়েছে । কারণ এর পরবর্তী স্তবকগুলোতে মাতৃভূমিকে দেবীরূপে (দুর্গা) কল্পনা করা হয়েছে, যা কিছু ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে আপত্তির কারণ হয়েছে । তবুও এর প্রথম দুটি স্তবক সর্বজনগ্রাহ্য হওয়ায় তা জাতীয় গান হিসেবে মর্যাদা পেয়েছে ।
আজও “বন্দে মাতরম” ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের স্মৃতি বহন করে এবং দেশপ্রেমের এক অমর প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয় আজও মানুষের হৃদয়ে গভীর প্রভাব ফেলে । এটি শুধু একটি গান নয়, বরং ভারতীয় জাতীয়তাবাদের এক শক্তিশালী ও ঐতিহাসিক প্রতীক ।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন