ভারতের জাতীয় সঙ্গীত এর ইতিহাস, যা না জানলেই নয়
ভারতের জাতীয় সঙ্গীত হলো জন গণ মন (Jana Gana Mana), যার রচয়িতা ছিলেন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর । এই গানটি মূলত ব্রাহ্ম ভাষায় রচিত এবং এতে ভারতের বিভিন্ন প্রদেশ, সংস্কৃতি ও জনগণের ঐক্যকে অত্যন্ত সুন্দরভাবে তুলে ধরা হয়েছে । ১৯১১ সালের ২৭ ডিসেম্বর কলকাতায় অনুষ্ঠিত Indian National Congress Session 1911-এ প্রথমবার এই গানটি গাওয়া হয় । পরে ১৯৫০ সালের ২৪ জানুয়ারি ভারত সরকার এটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে স্বীকৃতি দেয়, অর্থাৎ ভারতের সংবিধান কার্যকর হওয়ার ঠিক আগের দিন এই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় ।
“জন গণ মন”-এর প্রথম স্তবকটিই জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে গৃহীত হয়েছে, যার সম্পূর্ণ গাইতে প্রায় ৫২ সেকেন্ড সময় লাগে । গানটির মূল ভাব হলো— ভারতের জনগণের মনের অধিনায়ক বা অধিষ্ঠাত্রী শক্তির বন্দনা করা এবং দেশের ঐক্য, অখণ্ডতা ও বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্যের বার্তা তুলে ধরা । অনেক সময় সমালোচকেরা ভুলভাবে মনে করে যে এই গানটি ব্রিটিশ রাজাকে উদ্দেশ্য করে লেখা, কিন্তু বাস্তবে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নিজেই স্পষ্টভাবে জানিয়েছিলেন যে এটি ভারতের জনগণের ভাগ্যবিধাতার প্রতি নিবেদিত, কোনো রাজা বা শাসকের উদ্দেশ্যে নয় ।
এই জাতীয় সঙ্গীতের সুর ও ভাবগম্ভীরতা ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় দেশবাসীর মধ্যে দেশপ্রেম জাগ্রত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে । আজও স্কুল, সরকারি অনুষ্ঠান, ক্রীড়া প্রতিযোগিতা এবং জাতীয় দিবস—যেমন স্বাধীনতা দিবস ও প্রজাতন্ত্র দিবস-এ এটি গাওয়া হয় । জাতীয় সঙ্গীত গাওয়ার সময় সকল নাগরিককে সম্মানের সাথে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা বাধ্যতামূলক, যা দেশের প্রতি শ্রদ্ধা ও একাত্মতার প্রতীক । এইভাবে “জন গণ মন” শুধু একটি গান নয়, বরং ভারতের জাতীয় পরিচয়, ঐক্য ও গৌরবের এক অমূল্য প্রতীক ।
ভারতের জাতীয় সঙ্গীত জন গণ মন সম্পর্কে আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানা যায়, যা এর ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক গুরুত্বকে আরও গভীরভাবে বোঝায় । এই গানটি প্রথমে তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা-এ ১৯১২ সালে “ভারত ভাগ্য বিধাতা” শিরোনামে প্রকাশিত হয় । গানটির সুরারোপও করেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, যা একধরনের ব্রাহ্মসঙ্গীতের ধাঁচ অনুসরণ করে তৈরি। পরবর্তীকালে বিভিন্ন শিল্পী এই গানটির সুরে সামান্য পরিবর্তন আনলেও মূল সুর অপরিবর্তিত রয়েছে ।
১৯৪২ সালে সুভাষচন্দ্র বসু-এর নেতৃত্বে গঠিত আজাদ হিন্দ ফৌজ-এ এই গানটির হিন্দি সংস্করণ “শুভ সুখ চৈন” নামে ব্যবহৃত হয়, যা জাতীয় চেতনা জাগ্রত করতে বিশেষ ভূমিকা পালন করে । স্বাধীনতার পর জাতীয় সঙ্গীত নির্বাচনের সময় “জন গণ মন”-এর পাশাপাশি বন্দে মাতরম-কেও গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করা হয়েছিল । যদিও শেষ পর্যন্ত “জন গণ মন” জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে গৃহীত হয়, “বন্দে মাতরম” জাতীয় গান (National Song) হিসেবে মর্যাদা পায় ।
এই জাতীয় সঙ্গীতের একটি সংক্ষিপ্ত সংস্করণও রয়েছে, যা প্রায় ২০ সেকেন্ডে গাওয়া যায় এবং বিশেষ পরিস্থিতিতে ব্যবহৃত হয় । এছাড়া ১৯৫০ সালে জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার পর ভারতের সংবিধান সভা এই গানটির গাওয়ার নিয়ম ও মর্যাদা নির্ধারণ করে । পরে Prevention of Insults to National Honour Act 1971 অনুযায়ী জাতীয় সঙ্গীতের অসম্মান করা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে গণ্য হয় ।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—“জন গণ মন” ভারতের ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে প্রতিফলিত করে । এতে পাঞ্জাব, সিন্ধু, গুজরাট, মরাঠা, দ্রাবিড়, উৎকল ও বঙ্গের উল্লেখ রয়েছে, যা ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলকে একত্রে যুক্ত করে । এর মাধ্যমে বোঝানো হয়েছে যে ভিন্ন ভাষা, সংস্কৃতি ও প্রথা থাকা সত্ত্বেও ভারত এক অবিচ্ছেদ্য জাতি ।
এছাড়া আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও এই গানটির মর্যাদা অত্যন্ত উচ্চ । অনেক বিদেশি সংগীতজ্ঞ ও গবেষক “জন গণ মন”-এর সুর ও গঠনকে অত্যন্ত প্রশংসা করেছেন । এর ধীর, গম্ভীর ও মর্যাদাপূর্ণ সুর ভারতের ঐতিহ্য ও আত্মপরিচয়কে বিশ্বদরবারে তুলে ধরে । এই সমস্ত কারণেই “জন গণ মন” শুধু একটি জাতীয় সঙ্গীত নয়, বরং ভারতের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ঐক্যের এক অমূল্য দলিল হিসেবে বিবেচিত হয় ।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন