'হারুন সালেমের মাসি' - নামকরণের তাৎপর্য

'হারুন সালেমের মাসি' - নামকরণের তাৎপর্য

'হারুন সালেমের মাসি' - নামকরণের তাৎপর্য


      নামকরণের মধ্য দিয়ে লেখক তার ব্যক্তিগত অভিপ্রায়কে চরিতার্থ করতে চান । লেখকের প্রতিভার জাদুস্পর্শে তা আকর্ষণীয় হয়ে উঠে । নামকরণ সাধারণত কতকগুলি বিষয়ের উপর নির্ভরশীল । যেমন-চরিত্র, ঘটনা, রূপক, সংকেত ও কোনো গূঢ় ব্যঞ্জনা ।

     উপরিউক্ত আলোচনার আলোকে প্রগতিবাদী লেখিকা মহাশ্বেতা দেবীর রচিত 'স্তন্য দায়িনী ও অনান্য গল্প' নামক গ্রন্থ থেকে সংকলিত 'হারুন সালেমের মাসি' নামক গল্পের নামকরণ বিচার করতে গিয়ে বলতে হয় এ নামকরণটি চরিত্র কেন্দ্রিক হয়েছে ।

       মহাশ্বেতা দেবীর 'হারুন সালেমের মাসি' গল্পে প্রধান ও মুখ্যচরিত্র হল গৌরবি। সে খুবই গরিব, খোঁড়া । তার একটি ছেলে আছে, তার অবস্থা ভালো । কিন্তু সে তার মাকে দেখে না । মেয়ে আছে গৌরবির, সে মেয়ে এখন দিরিদ্র । তাই সেখানেও গৌরবির ঠাঁই হয়নি-গৌরবি শাক, পাতা ইত্যাদি জঙ্গল থেকে তুলে এনে বিক্রয় করে নিজের জীবিকানির্বাহ করে । তার নিঃসঙ্গ জীবনে হঠাৎ এসে হাজির হয়ে গেল অসহায় মাতৃপিতৃহীন শিশু হারুন সালেম । সে মুসলমান শিশু । মা-কে হারিয়ে সে গৌরবিকেই চেপে ধরল । তাকে মাসি বলে ডাকতে থাকল । এই পর্যায় থেকে গৌরবি ধীরে ধীরে হারুন সালেমের মাসি এবং শেষে মাসি থেকে মা হয়ে গেল । সেই গল্পই লেখিকা আমাদের শুনিয়েছেন । সেই জন্যেই তিনি তাঁর গল্পের নামকরণ করলেন, 'হারুন সালেমের মাসি'। দেখা গেল, মাতৃত্বের কাছে কোনো জাতপাত নেই । কোনো শর্তেই বাপ-মা-হারা হারাকে দূর করে দিতে পারল না গৌরবি । আশ্রয় দিয়ে ফেলল সে হারাকে মায়ের স্নেহভালোবাসায় গভীর এক স্নিগ্ধছায়ায় ।

       এই গল্পের নাম 'গৌরবি' রাখা যেত । কিন্তু লেখিকা তাঁর গল্পের নাম 'গৌরবি' না রেখে রেখেছেন 'হারুন সালেমের মাসি' । গৌরবির এই পরিচয়ের মধ্য দিয়ে লেখিকা তাঁর নামকরণকে অর্থবহ করে তুলেছেন, যা তাঁর নামকরণ নৈপুণ্যের পরিচয় বহন করে আনে ।

        নতুন ভূমিকায় মুহূর্তে গৌরবি অসাধারণ হয়ে ওঠে । মাতৃত্বকে সবার ওপরে রেখে, জাতপাতের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হয়ে, শহরের অজানা জীবনে পাড়ি দেওয়ার মধ্যে দিয়ে সে হয়ে গেল অসাধারণ । এই কারণেই গৌরবি অবিস্মরণীয় হয়ে উঠল হারুন সালেমের মাসি হিসেবে । সাম্প্রদায়িক চরিত্রের হওয়া সত্ত্বেও শেষপর্যন্ত এই গল্পটি এক মা-হারা বালক এবং সন্তান পরিত্যক্ত এক মায়ের গল্পে পরিণত হয়েছে । আলাদা ধর্মের মানুষ হওয়া সত্ত্বেও কীভাবে তারা মানবকিতার এক অবিচ্ছেদ্য বন্ধনে জড়িয়ে পড়ে তাই হল এই গল্পের প্রধান উপজীব্য । মধ্যযুগের বাগদাদের খলিফা 'হারুণ অল্ রসিদ' বা 'হারুণ সালেমের' নামটি এই গল্পে ব্যঙ্গার্থে ব্যবহার করা হয়েছে । পারিবারিকভাবে সম্পর্কহীন, 'মাসি' সম্বোধনে পরিচিতা এক নারী কীভাবে এক মাতৃহারা বালকের সার্থক মা হয়ে ওঠে, কাহিনির নামকরণটি তার ইঙ্গিতও বহন করে । তাই এই নামকরণটি মোটের ওপর সার্থক বলা যায় ।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

প্রকাশিত হলো UGC - NET December 2025 পরীক্ষার Answer Key

প্রবন্ধ রচনা - সাম্প্রদায়িকতা ও ছাত্রসমাজ

আপার প্রাইমারি 2026, Social Studys থেকে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্তর - ক্লাস 1