"হারুন সালামের মাসি" গল্পের সারাংশ

 "হারুন সালামের মাসি" গল্পের সারাংশ


      অজ পাড়াগাঁয়ে, জীর্ণ এক কুঁড়েঘরে গৌরবির বাস । তার স্বামী নেই । মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে। ছেলে তাকে দেখে না, থাকে অন্যত্র । গৌরবি জন্ম-খোঁড়া । শাক, পাতা, গুগলি তোলার জন্য তাকে প্রতিবেশী হারার মায়ের ওপর নির্ভর করতে হয় । এইসব শাক-গুগলি সে বিক্রি করে যশির (যশোদার) কাছে । গল্পের শুরুতে মুসলমান সন্তান রুগ্ন হারা গৌরবি মাসিকে জানায়, তার মা ডাকলে সাড়া দিচ্ছে না ।

        অনাথ হয়ে গেল, হারা । এই অনাথ শিশুর দায়িত্ব নিতে তার কাকা রাজি নয় । তাই হারা চলে এল গৌরবির কাছে । হারা দেখল, গৌরবিই তার ভরসা । এই গৌরবিই তার আসল মাসি । অগত্যা গৌরবি তাকে আশ্রয় দিল । নিজে একগাল খুদ খেল ও হারাকেও কিছুটা দিল । চাটাই পেতে তারা শুয়ে পড়ল । সাত পাঁচ ভাবতে লাগল গৌরবি । মা-বাপ হারা কি সত্যিই তার কাছে থাকতে এসেছে ? তাহলে তো মহাবিপদ । তার নিজেরই চলে না, পরের জমিতে বাস, তার ওপর মুসলমানের ছেলে । গৌরবি খুবই ফাঁপরে পড়ে গেল ।

       গৌরবি দেখে, ঘুমের মধ্যে হারা ফোঁপাচ্ছে । হারাকে ডেকে পাশ ফিরে শুতে বলে গৌরবি । এরপর গৌরবি হারার পাশেই শুয়ে ঘুমানোর চেষ্টা করে । গৌরবি স্বপ্ন দেখে হারার মা তার হাত ধরে এক অপূর্ব স্বর্গীয়দেশে নিয়ে গেছে, যেখানে কত থানকুনি, দূর্বা । আর মাদার গাছের ছায়ায় কত ঢেঁকিশাক ।

         সকালে উঠে গৌরবি হারাকে পাঠায় যশিকে এই খবর দিতে যে, সে যেন একবার গৌরবির সঙ্গে দেখা করে । আর হারা যেন খালপাড় থেকে থানকুনি পাতা তুলে আনে । আর কেউ জিজ্ঞেস করলে সে যেন বলে, মাসির উঠোনে সে শুয়ে ছিল, ঘরে নয় । গৌরবি পরম স্নেহে হাঁড়ির মধ্যে পড়ে থাকা মিয়োনো চালভাজা কুড়িয়ে-বাড়িয়ে একটা ছোট্ট পোটলা করে হারার হাতে দিয়ে বলে, সে এই খাবার খেয়ে যেন জল খায় ।


হারা যায় খালপাড়ে । এদিকে গৌরবি ঘর গেরোস্থালির কাজ সেরে দেখে তার ভাঁড়ারে অল্পই চাল আছে । চাল, ডুমুর, মোচার কচি ফুল নুন দিয়ে উনুনে চাপিয়ে গৌরবি ভাবতে থাকে কী করে সে হারার সঙ্গে এক সথে খাবে । এখন থেকে সেই বা কেমন করে জাতধর্ম বজায় রাখবে ? তার সমাজের লোকই বা তাকে কী বলবে । -গৌরবি বড়ো সমস্যায় পড়ে যায় ।


শেষে অনেক ভেবেচিন্তে গৌরবি নিজের ছেলের কাছে যায় । ছেলে নারায়ণ বিবাহিত । ভালো অবস্থা । সেখানে গিয়ে আশ্রয় পেলে মন্দ হয় না, এই ভেবেই ছেলের কাছে যাওয়া । ছেলে সে সময় বাড়িতে ছিল না-ছেলের বউ বেশ ভালো ব্যবহারই করে । চা-জল দেয়, দু'টো টাকা ও একটা কাপড় দেয় । গৌরবি বউয়ের কাছে এক'শ টাকা নেবার জন্যে আবদার করে বসে । সে একটা গোরু কিনবে । দুধ ঘুঁটে বেচে তাদের দু'টি প্রাণীর তাতে চলে যাবে । দুটি প্রাণী শুনে বউয়ের প্রশ্নে হারার কথা এসে পড়ে । পরে ছেলে নিবারণ বাড়ি ফিরে আসে, সব কথা শুনে তো নিবারণ মায়ের ওপর বেজায় খাপ্পা । সে শিগগির মুসলমানের ছেলেটাকে বিদেয় করতে বলে । পাপটাকে বিদেয় করে মা চলে আসুক তার কাছে । এই প্রসঙ্গে গৌরবি তার ছেলেকে হারার একটা ব্যবস্থা করে দিতে বলে । নিবারণ বলে, ওকে ওর জায়গায় পাঠিয়ে দিতে হবে, অর্থাৎ মুসলমানদের দেশে-ওদের সমাজে । সেখানে হারা মরলে মরবে-বাঁচলে বাঁচবে। এই শত্রুকে বিদেয় করতে হবে । এর পরে এ-কথা সে-কথায় ছেলে আর ছেলে বউয়ের মধ্যে ভীষণ ঝগড়া বেধে যায় ।


যাই হোক, হারাকে ছেড়ে গৌরবি নিজের ছেলের কাছে থাকতে চায় না, তাই সে ছেলের বাড়ি থেকে চলে আসে । হারাকে নিয়ে ফিরে আসে তার সেই অন্ধকার কুঁড়েতে। নিজের ঘরে শোয়, হারাকে শোয়ায় দাওয়ায় । কিন্তু লোককে বানিয়ে বলে যে হারা শোয় উঠোনে । জাতি ধর্মের ব্যাপারটি সে ভুলতে চায় । ইতিমধ্যে যশি ওরফে যশোদার সঙ্গে কথা হয় গৌরবির । যশি ব্যাপারটি সহজ করে দিয়ে বলে, হারাকে শহরে গিয়ে ছেড়ে দিয়ে এলেই ভালো হয় । সেখানে সে ভিক্ষে করে খাবে । যশির এই প্রস্তাব মানতে পারে না গৌরবি ।

          কদিন পরে মুকুন্দ আসে পিসির কাছে । তার ঘরেতে গৌরবির বাস । সে এসে হারাকে বিদেয় করে ছেলের কাছে গৌরবিকে চলে যেতে বলে । পালবাবুদের কাছে সে তার এ ভিটেটা বেচে দেবে, তারা এঘরে গুদাম বানাবে । একটা মুসলমান ছেলেকে তার পিসি ঘরে তুলেছে শুনলে পালবাবুরা রেগে যাবে । তাদের ঘরে পুজো-আচ্চা আছে । এ বাড়ি গৌরবিকে ছেড়ে দিতে হবে বলে মুকুন্দ পিসির কোনো কথা আর কানে নেয় না ।

            দিশেহারা গৌরবি রেগে গিয়ে হারাকে দূর করে দেয় । হারা ভয় পেয়ে নিজের ঘরে ফিরে গিয়ে কাঁদতে কাঁদতে এক সময় ঘুমিয়ে পড়ে । ঘুমের মধ্যে হারা যেন মাকে কাছে পায় । হঠাৎই তার মনে হয়, কে যেন তাকে ঠেলছে । ঘুমের ঘোরে হারার প্রথমে মনে হয়েছিল এ যেন তার মা ।

          ঘুম ভাঙলে অন্ধকার ঘরে সে ভয় পেয়ে যায় । মাসি বলে চেঁচিয়ে ওঠে । গৌরবি তাড়াতাড়ি ভয় ভাঙানোর জন্যে জানায়, সে হল হারার মাসি । গৌরবি হারাকে তখন বলে যে তারা শহরে চলে যাবে । সেখানে গিয়ে তারা ফুটপাথে শোবে, ভিক্ষে করে দিন কাটাবে । সেখানে কেউ তাদের জাতের পরিচয় নিয়ে কথা বলবে না । -এই ব্যবস্থায় দু'জনে কাছাকাছি থাকবে । ছাড়াছাড়ি হবে না ।

        পরিচয়হীন হয়ে বাঁচার জন্য চলে যায় শহরে । শহরের জনসমুদ্রে একবার মিশে যেতে পারলে জাতিধর্মের কোনো ভয় আর থাকবে না ।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

প্রকাশিত হলো UGC - NET December 2025 পরীক্ষার Answer Key

প্রবন্ধ রচনা - সাম্প্রদায়িকতা ও ছাত্রসমাজ

আপার প্রাইমারি 2026, Social Studys থেকে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্তর - ক্লাস 1