প্রবন্ধ রচনা - সাম্প্রদায়িকতা ও ছাত্রসমাজ

 

প্রবন্ধ রচনা - সাম্প্রদায়িকতা ও ছাত্রসমাজ


প্রবন্ধ রচনা - সাম্প্রদায়িকতা ও ছাত্রসমাজ

"সাম্প্রদায়িকতা হল বিভেদনীতি-মানবতার পথে বাধা, 

জাতীয় ঐক্যের পরিপন্থী-গরমিলে সুর সাধা।”

ভূমিকা: বৈচিত্র্যের ভেতর ঐক্য
                    আমাদের সোনার ভারতে 'নানা ভাষা, নানা মত, নানা পরিধান ।' এখানে বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী ও বহু ভাষাভাষী মানুষ বসবাস করে । কিন্তু, এত প্রভেদ সত্ত্বেও আমরা এক সূত্রে গ্রথিত সহস্র কোটি প্রাণ । কবির ভাষায় - “বিবিধের মাঝে দেখ মিলন মহান।" সাম্রাজ্যবাদী শাসকের ষড়যন্ত্রে আমাদের সেই জাতীয় ঐক্য কালে কালে দ্বিধাবিভক্ত হয়েছে । আজও একবিংশ শতাব্দীতে স্বার্থপরতার হীন ষড়যন্ত্রে জাতির ঐক্য বিপন্ন । কোথায় বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য ? কোথায় বিবিধের মাঝে মহান মিলন ? আজ দিকে দিকে হিন্দু মুসলমানের মধ্যে বিরোধ দেখা দিয়েছে । দেখা দিয়েছে উন্নত ও অনুন্নত সম্প্রদায়ের মধ্যে শ্রেণিসংগ্রাম । এই পরিপ্রেক্ষিতে ছাত্রদের কী করণীয় তা ভেবে দেখবার সময় এসেছে ।
ধর্মনিরপেক্ষতা ও ছাত্রসমাজ
                    ভারত এক ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র । এ কথার অর্থ হল-জাতিধর্মবর্ণনির্বিশেষে এদেশের মানুষ সুখে শান্তিতে যে-কোনো স্থানে বাস করতে পারে । আমাদের সংবিধান আমাদের সেই অধিকার দিয়েছে । কিন্তু, সে শান্তি আজ বিঘ্নিত । শোনা যাচ্ছে বলদর্পী শক্তির পদধ্বনি । স্বার্থের চক্রে অশান্ত ঘূর্ণিতে মানুষ আজ আতঙ্কিত, সন্ত্রস্ত । এমতাবস্থায় ষড়যন্ত্রকারীকে প্রতিরোধ করতে পারে কে ? সে শক্তি ও সাহসের অধিকারী উদীয়মান ছাত্রদল । কারণ, ছাত্ররা অফুরন্ত প্রাণপ্রাচুর্যে পূর্ণ, তাদের কাছে "জীবন মৃত্যু পায়ের ভৃত্য চিত্ত ভাবনা হীন ।" রবীন্দ্রনাথ বলেছেন - "ছাত্র সমাজ হল মানব সমাজের সজীবতম অংশ শাশ্বত নীলকণ্ঠ ।" নজরুলের ভাষায় - "আমরা শক্তি, আমরা বল / আমরা ছাত্রদল ।" তাই, ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে ঐতিহাসিক মিছিলে অগণিত ছাত্র বজ্রকণ্ঠে ঘোষণা করেছিল- "ভাই-এ ভাই-এ লড়ব না, দাঙ্গা করে মরব না ।" ছাত্ররাই বলতে পেরেছিল 'মোদের মাঝে মুক্তি কাঁদে বিংশশতাব্দীর ।" আজও তারা পারে প্রতিবাদের ভাষা গর্জে তুলে নতুন কিছু সৃষ্টি করতে । সাম্প্রদায়িক ভেদবুদ্ধিকে দূরে সরিয়ে দিয়ে শান্তির পথ রচনা করতে ।

 
গণতন্ত্রের ভূমিকা
                   ১৯৮৪ তে ইন্দিরা গান্ধির মৃত্যুতে শিখ-সম্প্রদায়ের ওপর যখন বিকৃত আক্রোশ সাম্প্রদায়িকতার চেহারা নিতে শুরু করে, তখন সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির জাগ্রত প্রহরীর ভূমিকা নেয় বাংলার অগ্রগামী ছাত্রসমাজ । রাম মন্দির - বাবরি মসজিদ বিতর্কে যখন ভারতের ভাগ্যাকাশে অশনিসংকেত, তখনও ছাত্রসমাজ দৃপ্ত পদক্ষেপে প্রতিরোধ গড়ে তোলে, উচ্চারণ করে "আমাদের সংস্কৃতি, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ।" উড্ডীন হয় ধর্মনিরপেক্ষ গণতন্ত্রের বিজয় পতাকা । তাই আজ ভারতবর্ষে সাম্প্রদায়িকতার যে কালো মেঘ ঘনিয়ে এসেছে, তাতে ভয়ের কারণ আছে । বিদ্যার্থীগণ, যারা 'মরু ঝঞ্ঝার বেদুইন', তারা যুক্তিহীন - মানবিকতাহীন দানবীয় ঘটনাবলির নিরপেক্ষ দর্শক হয়ে থাকতে পারে না । কারণ, ছাত্রদল স্পর্ধায় নেয় মাথা তুলবার ঝুঁকি । আজকের যে-ছাত্রসমাজ ভবিষ্যতে তারা রাষ্ট্রপরিচালক, জাতির ভবিষ্যৎ, তাই প্রথম থেকেই এমন একটা জটিল ব্যাধি সম্পর্কে ছাত্রদের সম্যক অবহিত হয়ে থাকা জরুরি । দেশের সমস্যা সম্বন্ধে ছাত্রদেরকে অবহিত হতে হবে । এর মূলোচ্ছেদ বন্দুক, বেয়নেটেও সম্ভব নয়। মহাত্মা গান্ধির 'Psycho-analytical method'-এর দ্বারা কাজ হতে পারে বলেই এ গুরুদায়িত্বভার ছাত্রদলের ওপর । সাম্প্রদায়িকতার বীজ উপড়ে ফেলার জন্য চাই মানসিক ও সামাজিক প্রস্তুতি । এ দায়িত্ব একমাত্র ঐক্যবদ্ধ, সংগ্রামী চেতনাসম্পন্ন ছাত্ররাই নিতে পারে । রাষ্ট্রীয় প্রচেষ্টার মাধ্যমে দেশের ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিবোধ প্রথম থেকেই জাগিয়ে তুলতে হবে, প্রচার করতে হবে- 'আমাদের শুধু একটিই পরিচয় আমরা ভারতবাসী ।'
                    বর্তমানে অযোধ্যা কান্ডের পুনঃ প্রবর্তনের ফলে মহারাষ্ট্রের দাঙ্গা থেকে আজ এদেশে মৌলবাদী সাম্প্রদায়িক শক্তিগুলি তাণ্ডব শুরু করে শান্তিকামী মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে । জেগে উঠছে আবার সেই ভেদবুদ্ধি । এমন পরিস্থিতিতে ছাত্রদের উচিত সকল সাম্প্রদায়িক ভেদবুদ্ধি ও রাজনীতির ঊর্ধ্বে থেকে এর উপযুক্ত প্রতিরোধ করা । এমন ক্ষেত্রে ছাত্রদের অসাম্প্রদায়িক চেতনা সৃষ্টির জন্য এগিয়ে আসতে হবে । অঞ্চলে-অঞ্চলে, এলাকার সর্বধর্মের লোকদের নিয়ে সংহতি-সম্প্রীতির জন্য মিটিং ও আলোচনা সভা করতে হবে । সবাইকে বোঝাতে হবে হিংসাই দাবি আদায়ের একমাত্র পন্থা নয় ।
                    পাড়ায় পাড়ায় শান্তি মিছিল করে ধর্মের উন্মাদনার কুফল বোঝাতে হবে সাধারণ নাগরিকদের । সামান্য হাঙ্গামা ও গুজব ছড়িয়ে পড়লেই ছাত্রদের বঝাঁপিয়ে পড়তে হবে সর্বাগ্রেই । এগুলো হল ছাত্রদের প্রত্যক্ষ কর্তব্যের পথনির্দেশিকা । পরোক্ষ কর্তব্য হল, জনগণের নিরক্ষরতা দূরীকরণ করে ধর্মীয় গোঁড়ামি ও কুসংস্কার দূরীভূত করা । এর জন্য ছাত্ররা অবসর সময়ে বয়স্ক শিক্ষাকেন্দ্র ও নৈশ পাঠশালা খুলে গণশিক্ষার প্রসার ঘটাতে পারে । মহাপুরুষের বাণী দিকে দিকে ছড়িয়ে দিতে হবে । বিজ্ঞান চেতনার প্রসার ঘটাতে হবে । জাতীয় সংহতির বাণী দিকে দিকে ছড়িয়ে দিয়ে বলতে হবে "সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই ।" মানুষের উপরে নাই কোনো মহীয়ান । তাকে জানাই আমাদের পরম ও চরম কর্তব্য । তবেই সাম্প্রদায়িকতার ভূত আর ভয় দেখাবে না-একথা সত্য ।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

প্রকাশিত হলো UGC - NET December 2025 পরীক্ষার Answer Key

আপার প্রাইমারি 2026, Social Studys থেকে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্তর - ক্লাস 1