প্রবন্ধ রচনা - একটি ছুটির দিন

 প্রবন্ধ রচনা - একটি ছুটির দিন 

প্রবন্ধ রচনা - একটি ছুটির দিন


"ছুটি পেলেই হৃদয়পুরে বাজায় কে যে বাঁশি,

 যেদিকে চায়, খুঁজে যে পায়, মজা রাশি রাশি ।"

                হঠাৎ পাওয়া গেল একটি ছুটির দিন । -একেবারে আচমকা । অপ্রত্যাশিত । একটানা পড়াশোনার সুকঠিন একঘেয়েমির ভেতর এসে হাজির হয়ে গেল অপ্রত্যাশিত একটি ছুটির দিন । গুমোট গরমের পর যেন এক পশলা বৃষ্টি ।

               কুসুমের ভেতর যেমন সৌরভ, মধুর মধ্যে যেমন মিষ্টতা বা মরুভূমিতে যেমন 'ওয়েসিস', অনেকটা সেই ভাবেই পাওয়া গেল এই ছুটিটিকে । -আর সঙ্গে সঙ্গে মনের ভেতর গুনগুনিয়ে গুঞ্জরিত হয়ে উঠল রবীন্দ্রনাথের সেই গান, "আজ আমাদের ছুটি রে ভাই, / আজ আমাদের ছুটি।"

মনের ভেতর রবীন্দ্রনাথের ওই গানটি বারবারই ধ্রুপদী সংগীত হয়ে আমাদের মনকে মাতিয়ে তুলতে থাকল ।

"কী করি আজ ভেবে না পাই,

 পথ হারিয়ে কোন্ বনে যাই।"

    ছাত্রজীবনে ক্রমবর্ধমান পড়ার চাপ । ভালো Result-এর জন্য শুধু পড়া আর পড়া । সাহিত্য, ভূগোল, অংক হঠাৎ পাওয়া একটি -কোনো বিষয়কে বাদ দেওয়ার নেই। পরীক্ষার বৈতরণী পার হতে হবে তো ? তাই, ছুটি

কোথায় ? কোথায় অবকাশ ?

         কিন্তু এই নিরন্দ্র বিদ্যাচর্চাও হঠাৎ ধাক্কা খেল । সব প্রোগ্রামকে বিধ্বস্ত করে হঠাৎ এসে হাজির হল ওই ছুটি । স্কুলে গিয়ে শুনলাম বিদ্যালয়ের ছেলেরা গতকাল জেলা টুর্নামেন্টে খেলতে গিয়ে 'কাপ' জিতে এসেছে । -সুতরাং ওই অসাধারণ সাফল্যের জন্য ছুটি মঞ্জুর, বিদ্যালয় বন্ধ ।

 স্কুলে এসে জানা গেল এই ছুটির খবর । আগে নয় । সুতরাং বই বিছিয়ে পড়ার টেবিলে গিয়ে বসার ব্যপারটা আর আসে না । আবার এই মুহূর্তে বাড়ি ফিরে যাওয়ার কোনো মানে হয় না । সুতরাং এখন কী করা যায় ? এমন সময় দেবদূতের মতো আমাদের বাংলার শিক্ষক মশায়ের সথে দেখা মিলল । উনিও ছুটির খবর না জেনেই স্কুলে এসেছিলেন । উনিই আমাদের মনের কথা বুঝতে পেরে বললেন- "যদি তোমরা বাড়ি ফিরে না যাও, তাহলে আমি তোমাদেরকে এক জাগায় নিয়ে যেতে পারি । যারা যেতে চাও আমার সাথে এস এবং বাড়িতে জানিয়ে দাও ।"

           আমরা চারজন স্যারের কথায় রাজি হলাম । বাড়িতে জানিয়ে দিলাম । মনের ভেতর একটা খুশির ভাব আমাদেরকে অধীর করে তুলল । গঙ্গার বুকে লঞ্চে চেপে আমরা গঙ্গাতীরের বিশেষ একটি জায়গায় গিয়ে হাজির হলাম । -জায়গাটির নাম, 'ফেয়ারলি'। তখন দুপুর বেলা । তেমন ভিড়ভাট্টা নেই । মাস্টারমশাই আগে আগে হাঁটেন, আমরা চলি তাঁর পিছু পিছু । খানিকটা এগিয়ে যাবার পর নদী তীরের একটি সুন্দর বাগানের সামনে এসে থমকে দাঁড়ালেন মাস্টারমশাই । ঈষৎ গম্ভীর স্বরে তিনি আমাদের দিকে তাকিয়ে বললেন, 'চেনো নাকি এই বাগানটা ? - জানো কি এর নাম ? -এর নাম হল 'মিলেনিয়াম পার্ক' । দু'হাজার খ্রিস্টীয় সনের ব্যাপারটা মাথায় রেখে এই ধরনের নামকরণ করা হয়েছে । আজকে হঠাৎ ছুটির দিনে এই পার্কটিকে আমরা উপভোগ করতে চাই । কী, ব্যাপারটি কি খুব খারাপ হবে ?

       খারাপ ? -আমাদের মুখ দিয়ে যেন কথা সরছে না ? নদী তীরের এমন একটি সুন্দর বাগান আমরা জীবনে দেখিনি । গভীর বিস্ময়ে আমরা তাকিয়ে থাকলাম এই পার্কটির দিকে । পার্ক তো নয়, যেন স্বর্গের নন্দন কানন । ভেতরে ঢোকবার পর বিস্ময় আরও বেড়ে গেল । মাঝখান দিয়ে রঙিন পাথরে বাঁধানো রাস্তা । দু' পাশে নানা বর্ণের ফুলের গাছ । কেবল ফুলগাছ নয়, রয়েছে লতা-বিতান । বসবার কী সুন্দর ব্যবস্থা ! পাথরের সিংহাসন ।

         ওই সিংহাসনে বসে মনে হল, আমরা যেন এই সুন্দর ফুলবাগিচার রাজা । যেদিকে এবং যতদূর চোখ যায়, সবই যেন সুন্দরের রাজত্ব । কী পরিষ্কার বাগান, কোথাও কোথাও উচ্ছলিত ঝর্ণাধারা, ঝিরঝির করে জল ঝরছে কৃত্রিম পদ্মা দীঘিতে । একপাশে শহর কলকাতার স্ট্র্যান্ড রোড, ওপাশে প্রবাহিত গঙ্গা নদী । দুপুরের রোদ ঝিলিক দিচ্ছে গঙ্গার তরঙ্গমালায় । তরঙ্গের মাথায় হাজার হিরের ঝলক । অদূরে গঙ্গার বুকে দাঁড়িয়ে রয়েছে কয়েকটি জাহাজ । এক ঝাঁক গাং চিল উড়ছে জাহাজের মাথায় ।

মাথার ওপর বিশাল আকাশের চন্দ্রাতপ । এই চন্দ্রাতপে সাদা সাদা মেঘের ফালি । সূর্যের আলোয় সেখানে চলছে মেঘ ও রৌদ্রের খেলা । নদীর বুক থেকে ধীরে ধীরে প্রবাহিত হয়ে আসছে মৃদু শান্ত সমীরণ । কী মধুর বাতাস । মন ভরে গেল, হৃদয় জুড়িয়ে গেল ।

     এই গঙ্গা নদী । অপরূপ শোভা । এই নদীপথে জাহাজ আসত দেশ-বিদেশের মাল বহন করে । জাহাজ থেকে মাল নামাবার জন্য বানানো হয়েছিল বড়ো বড়ো 'ডেক' । আজ সেইসব জীর্ণ পাতার মতো ইতিহাসের গাছ থেকে খসে পড়েছে । স্ট্র্যান্ড রোডের পাশে গঙ্গার এই নদীতীর গত চারদশক পরিত্যক্ত হয়েই পড়েছিল । পড়েছিল বর্জ্য পদার্থের আস্তাকুড় হয়ে, আজ হঠাৎ তার নতুন রূপ হয়েছে । গঙ্গা তীরের সৌন্দর্যকে আমরা নতুন করে ফিরে পেয়েছি । দু'হাজার বছরের খ্রিস্টীয় সনকে ধন্যবাদ, তার স্মরণেই এই 'মিলেনিয়াম পার্কের' উদ্ভব ।

       শেষ দুপুরটা আমরা এই নদী তীরেই কাটালাম । -মাথার ওপর যে সূর্য ছিল, তা পশ্চিমে ঢলে পড়ল । পার্কের গাছে গাছে শোনা গেল পাখির কিচিরমিচির । ওপারের গঙ্গা তীরের কারখানার একটি কল থেকে ভোঁ বাজল । পশ্চিমের আকাশে ধরল লাল রং । -মহাকবি কীটস্ লিখেছিলেন, 'A thing of beauty is a joy forever' -ওই মহাকবির কথা বারবার মনে আসতে থাকল । ওই পার্কটি আমাদের মনকে এমনভাবে রাঙিয়ে তুলল, যা কোনো দিন ভুলব না । -কোনো দিন না ।

           ছক বাঁধা জীবনের ফাঁকে হঠাৎ আসা একটি ছুটির দিন আমাদের কাছে বহন করে নিয়ে এল একটি নতুন উপহার । যে উপহার আমাদের সর্বাঙ্গ ছুঁইয়ে দিল অমৃতের স্পর্শ । অপরাহু বেলায় আমরা ফিরে এলাম নিজের নিজের বাড়িতে । ফিরে এলাম ছুটির দিনের বুকভরা আনন্দের উপহার নিয়ে ।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

প্রকাশিত হলো UGC - NET December 2025 পরীক্ষার Answer Key

প্রবন্ধ রচনা - সাম্প্রদায়িকতা ও ছাত্রসমাজ

আপার প্রাইমারি 2026, Social Studys থেকে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্তর - ক্লাস 1