বাংলার লোকসংগীত
বাংলার লোকসংগীতের মধ্যে আছে বিভিন্ন ধরনের গান । বিভিন্ন ধরনের গায়কী রীতি । সুরের বৈচিত্র্যও কম নয় । বাউল গানের উদাস সুরে ফুটে গ্রাম বাংলার ফাঁকা মাঠের শূন্যতার রূপ । চাষীদের গাওয়া ভাওয়াইয়া গানের সুর মাঠের হাওয়ায় ভেসে বেড়ায় । দাঁড় টেনে নৌকা বেয়ে চলে মাঝিরা । তাদের গাওয়া ভাটিয়ালী গানের সুরে মন হয় উদাস । এ ছাড়াও আছে গাজন উৎসবের গান, নীলের গান, সারি, ঝুমুর ও খেমটা গান । আছে বোলান গান-ভাদু ও টুসু পরবের গান । আছে কৃষ্ণ-কীর্তন, শ্যামা-সংগীত, মঙ্গল-চণ্ডীর গান, ধর্মমঙ্গলের গান, বিষহরির পালা গান । এ সবই বাংলার লোকসঙ্গীত । মনের ভাবের সঙ্গে সংযোগ রেখেই এগুলি রচিত । এগুলি পোশাকী সংগীত নয় - বাঙ্গালীর অন্তর নিঃসৃত স্বতঃস্ফূর্ত সংগীত । সুর ও ভাবের অকৃত্রিমতায় এই সব সংগীত সমৃদ্ধ ।
বাংলার অধিকাংশ লোকসংগীতেই ধর্মের ভাব, প্রথা ও লোকাচার প্রচ্ছন্ন আছে । কথ্য ভাষায় পদবিন্যাসই লোকসংগীতের সাধারণ রীতি । প্রতিটি সংগীতই সাহিত্যরসে ও ভাব - গভীরতায় সমৃদ্ধ । আর সুরের কথা বলতে গেলে বলতে হয় - এ সব গানের সুর স্বতঃস্ফূর্ত ও আঞ্চলিক বৈশিষ্ট্যযুক্ত । সুরের মধ্যে থাকে বিভিন্ন রাগ-রাগিণীর প্রচ্ছন্ন প্রভাব । তাল সহজ । আর গানের অস্থায়ী ও অন্তরা ভাবেই দেখা যায় গায়কী রীতির বৈশিষ্ট্য । কোন গান গাওয়া হয় টানা সুরে-কোন কোন গান আবৃত্তির অনুরূপ । কোন গান গীত হয় একক বা দ্বৈতকণ্ঠে-কোনটি-বা সমবেতকণ্ঠে । গান ভাবে অকৃত্রিম, সুরে স্বতঃস্ফূর্ত । সুরে মিশে থাকে বাংলার আকাশ-বাতাস, বন-প্রান্তরের উদাসভাব ও মর্মকথা ।
লোকসংগীতের ভাষাতেও দেখা যায় আঞ্চলিক বৈশিষ্ট্য । গানের পদ-সংযোজনায় থাকে না কোন ব্যাকরণের অনুশাসন । এই সব গানের সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের বাজনা বাজানো হয় । বাজানো হয় একতারা, দোতারা, খঞ্জনী, সারেন্দা, গাবগুবী, ঢাক ও ঢোল। কখনও কখনও মৃদঙ্গও বাজানো হয় ।
সুর বৈচিত্র্য নিয়ে বাংলার লোকসঙ্গীতে আছে নদীর গান, মাঠের গান, বিলের গান, ঘাটের গান, বাটের গান, আঙিনা ও অন্দরের গান, কবিগান । উৎসবে, ধর্মচিন্তায়, সুখে-দুঃখে, জন্ম-মৃত্যু, থেকে শুরু করে দৈনন্দিন জীবনের তুচ্ছ ঘটনার ব্যাখ্যানও আছে ।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন