বাংলার লোকসংগীত

 

বাংলার লোকসংগীত

বাংলার লোকসংগীত


             প্রাচীন বাংলার সমাজ-জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোত ভাবে মিশে ছিল অনেক রকম পালাপার্বণ ও আমোদ - উৎসব । বাংলার গ্রামের চন্ডীমণ্ডপে বসত আসর, আঙ্গিনায় চলতো রামায়ণ পাঠ, চলতো কথকতা । প্রভাতী গান গেয়ে বৈষ্ণবেরা ঘুম ভাঙ্গাতো গ্রামবাসীদের । গাঁয়ের কবিরা গান বাঁধতেন । কতো রকমের গান । রামায়ণ - মহাভারতের আখ্যান অবলম্বনে গান । সমাজ-জীবনের সুখ-দুঃখ নিয়ে গান। আধ্যাত্মিক ভাবে সমৃদ্ধ গান । দেশপ্রেমের গান । বিভিন্ন দেব-দেবীর স্তুতি গান । গায়কদের মুখে মুখে এ সব গান গ্রাম হতে গ্রামান্তরে পড়ত ছড়িয়ে । এই সব গান বাংলার জনসাধারণের গান । এগুলিই বাংলার লোকসংগীত - বাংলার নিজস্ব সম্পদ । এইসব লোকসংগীত যে শুধু শ্রান্তি দূর করে তা নয়, এগুলি শিক্ষার বাহনও বটে। কতো নীতিকথা, হিতকথা, ধর্মকথা-এই সব গানের মাধ্যমে প্রচারিত হয় । বাংলার এই সব লোকসংগীত বাংলা সাহিত্যক পুষ্ট করেছে-সমৃদ্ধ করেছে ।

             বাংলার লোকসংগীতের মধ্যে আছে বিভিন্ন ধরনের গান । বিভিন্ন ধরনের গায়কী রীতি । সুরের বৈচিত্র্যও কম নয় । বাউল গানের উদাস সুরে ফুটে গ্রাম বাংলার ফাঁকা মাঠের শূন্যতার রূপ । চাষীদের গাওয়া ভাওয়াইয়া গানের সুর মাঠের হাওয়ায় ভেসে বেড়ায় । দাঁড় টেনে নৌকা বেয়ে চলে মাঝিরা । তাদের গাওয়া ভাটিয়ালী গানের সুরে মন হয় উদাস । এ ছাড়াও আছে গাজন উৎসবের গান, নীলের গান, সারি, ঝুমুর ও খেমটা গান । আছে বোলান গান-ভাদু ও টুসু পরবের গান । আছে কৃষ্ণ-কীর্তন, শ্যামা-সংগীত, মঙ্গল-চণ্ডীর গান, ধর্মমঙ্গলের গান, বিষহরির পালা গান । এ সবই বাংলার লোকসঙ্গীত । মনের ভাবের সঙ্গে সংযোগ রেখেই এগুলি রচিত । এগুলি পোশাকী সংগীত নয় - বাঙ্গালীর অন্তর নিঃসৃত স্বতঃস্ফূর্ত সংগীত । সুর ও ভাবের অকৃত্রিমতায় এই সব সংগীত সমৃদ্ধ ।

             বাংলার অধিকাংশ লোকসংগীতেই ধর্মের ভাব, প্রথা ও লোকাচার প্রচ্ছন্ন আছে । কথ্য ভাষায় পদবিন্যাসই লোকসংগীতের সাধারণ রীতি । প্রতিটি সংগীতই সাহিত্যরসে ও ভাব - গভীরতায় সমৃদ্ধ । আর সুরের কথা বলতে গেলে বলতে হয় - এ সব গানের সুর স্বতঃস্ফূর্ত ও আঞ্চলিক বৈশিষ্ট্যযুক্ত । সুরের মধ্যে থাকে বিভিন্ন রাগ-রাগিণীর প্রচ্ছন্ন প্রভাব । তাল সহজ । আর গানের অস্থায়ী ও অন্তরা ভাবেই দেখা যায় গায়কী রীতির বৈশিষ্ট্য । কোন গান গাওয়া হয় টানা সুরে-কোন কোন গান আবৃত্তির অনুরূপ । কোন গান গীত হয় একক বা দ্বৈতকণ্ঠে-কোনটি-বা সমবেতকণ্ঠে । গান ভাবে অকৃত্রিম, সুরে স্বতঃস্ফূর্ত । সুরে মিশে থাকে বাংলার আকাশ-বাতাস, বন-প্রান্তরের উদাসভাব ও মর্মকথা ।

              লোকসংগীতের ভাষাতেও দেখা যায় আঞ্চলিক বৈশিষ্ট্য । গানের পদ-সংযোজনায় থাকে না কোন ব্যাকরণের অনুশাসন । এই সব গানের সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের বাজনা বাজানো হয় । বাজানো হয় একতারা, দোতারা, খঞ্জনী, সারেন্দা, গাবগুবী, ঢাক ও ঢোল। কখনও কখনও মৃদঙ্গও বাজানো হয় ।

         সুর বৈচিত্র্য নিয়ে বাংলার লোকসঙ্গীতে আছে নদীর গান, মাঠের গান, বিলের গান, ঘাটের গান, বাটের গান, আঙিনা ও অন্দরের গান, কবিগান । উৎসবে, ধর্মচিন্তায়, সুখে-দুঃখে, জন্ম-মৃত্যু, থেকে শুরু করে দৈনন্দিন জীবনের তুচ্ছ ঘটনার ব্যাখ্যানও আছে ।

Post a Comment

নবীনতর পূর্বতন