প্রবন্ধ রচনা - চরিত্র গঠনে খেলাধুলা
"সুস্থ শরীর গড়ে তোলে সুস্থ একটি মন,
খেলাধুলার ভুবন মাঝে লুকিয়ে আছে জীবন ধন।"
ভূমিকা:
রবীন্দ্রনাথ বলেছেন- "জীবনমুখী শিক্ষা হইল সেইটাই, যেখানে মানসিক উৎকর্ষ সাধনের সঙ্গে দেহচর্চাকেও মিলাইয়া মিশাইয়া দেওয়া হয়।" -প্রকৃতপক্ষে দেহ ও মনের যুগল সম্মিলনে শিক্ষা পূর্ণতা পায়, জীবন হয় সত্যই সুন্দরতম । উপনিষদেও বলা হয়েছে- "বলহীনের দ্বারা আত্মা লাভ হয় না।" এর থেকে সহজেই অনুমেয় যে, জ্ঞান সাধনার দুশ্চর তপশ্চর্যায় নিযুক্ত হতে হলে, দৈহিক কর্মশক্তির একান্ত প্রয়োজন । যে-শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড বলে গণ্য, সেই মেরুদণ্ডকে ঋজু রাখার এক অনলস অনুশীলন হল খেলাধুলা । তাছাড়া 'Health is wealth', এই সুবচনকে জীবনে কার্যকরী করতে হলে, স্বাস্থ্য গঠন অপরিহার্য । দরকার খেলাধুলার ।
সেকালের শরীরচর্চা :-
প্রাচীনকালের আশ্রমিক শিক্ষাব্যবস্থায় ছাত্রদের অধ্যয়নই ছিল একমাত্র তপস্যা । যদিও তাঁরা বর্তমানের মতো তেমন ভাবে খেলাধুলার সুযোগ পেতেন না । তবুও তাঁদের দেহচর্চা, যোগ ব্যায়াম, প্রাণায়াম, ব্রাহ্ম মুহূর্তে শয্যাত্যাগ, আশ্রমের কার্যাবলী অনুসরণ ইত্যাদি করতে হত, কেবলমাত্র দেহকে সুস্থ-সবল ও নির্মল মানসিকতা বজায় রাখার জন্য । তাঁরা বলতেন-শরীরমাদ্যম্ খলু ধর্মসাধনম্'। শারীরিক সুস্থতার প্রয়োজনীয়তাকে তাঁরা উপলব্ধি করতেন।
খেলাধুলা থেকে শিক্ষা :-
শিক্ষা ও খেলাধুলা একে অন্যের পরিপূরক । খেলাধুলায় দৈহিক উৎকর্ষ সাধনের সঙ্গে মানসিক উৎকর্ষও সাধিত হয় । রুগ্ন ও জীর্ণ দেহ লেখাপড়া ও কাজকর্মের পক্ষে অনুপযোগী । শরীর সবল ও সুস্থ না হলে, মনও সুস্থ ও সবল থাকে না । ফলে মনোযোগ সহকারে কোনো কাজই করা যায় না । কাজে বিরক্তি, অনীহা ও আলস্য দেখা দেয় । তাই দেহ-মন সুস্থ রেখে বিদ্যার্জনের পথ সুগম করার জন্যই বিদ্যালয়ে পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলার ব্যবস্থা করা হয়ে থাকে । এছাড়া, দেহ ও মনের যুগলবন্দিতে গড়ে উঠে মানব চরিত্রের ইমারত । তাই, খেলাধুলা শিক্ষার এক প্রয়োজনীয় অঙ্গ ।
মানবিক গুণের বিকাশ :-
প্রকৃতপক্ষে খেলার সঙ্গে সঙ্গে শিশুর বুদ্ধিবৃত্তির বিকাশ ঘটে । তার আকাঙক্ষা, বিশ্বাস, দৃষ্টিভঙ্গি, আদর্শ জীবনমুখী রূপ পরিগ্রহ করে । চরিত্র সুগঠিত হয় খেলাধুলার মাধ্যমে । শিশুর মধ্যে শৃঙ্খলাপরায়ণতা, একাগ্রতা, দৃঢ়তা খেলাধুলার মাধ্যমেই জাগরিত হয়-যা ভবিষ্যৎ সুস্থ জীবনের পক্ষে একান্ত অপরিহার্য । জীবনের জয় পরাজয়কে খেলোয়াড়ি মনোভাবে তখনই গ্রহণ করা সম্ভব, যখন শিক্ষার সঙ্গে খেলাধুলা অঙ্গাঙ্গীভাবে মিশে থাকে । এইজন্য বর্তমানে শিক্ষা-মনস্তাত্ত্বিকগণ শিশুশিক্ষায় 'playway in education' পদ্ধতি চালু করে খেলাচ্ছলে শিশুকে শিক্ষা দিতে পরামর্শ দিয়েছেন । বিবেকানন্দ বলেছেন- "খেলার মধ্য দিয়েই শিক্ষার্থীর ব্যক্তিত্ব পায় উজ্জ্বলতা, হয়ে ওঠে সে নিয়মানুবর্তী, মানবতাবোধে হয় উদ্ভাসিত ।" রবীন্দ্রনাথ, গান্ধিজি এঁরা মুখস্থ বিদ্যা-সর্বস্ব শিক্ষার পরিবর্তে এই ধরনের জীবনমুখী শিক্ষার কথা বারংবার বলেছেন ।
প্রতিযোগী মনের সৃষ্টি :-
আধুনিক শিক্ষাতাত্ত্বিক ও মনস্তাত্ত্বিক শিলার, হার্বাট স্পেন্সার তাঁদের অতিরিক্ত তত্ত্বে খেলাধুলাকে "অতিরিক্ত শক্তির প্রকাশ পথ" বলে আখ্যা দিয়েছেন । একালের প্রায় সকল শিক্ষাবিদ্গণ লেখাপড়ায় খেলাধুলার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কথা বলেছেন । কেননা খেলাধুলার মাধ্যমে প্রতিযোগী মনের মুক্তি ঘটে, প্রতিযোগিতামূলক মনোভাবের সৃষ্টি হয় এবং নেতৃত্বলাভের আকাঙ্ক্ষা জাগ্রত হয় । ডিউক অব ওয়েলিংটন ওয়াটারলু'র জয় শেষে বলেছিলেন- "The battle of Waterloo was won on the playing field of Eton."
খেলাধূলা ও শরীরচর্চার নানাদিক :-
"We shall be nearer to heaven through football than through the Gita."-বিবেকানন্দের এই উক্তি থেকে খেলার গুরুত্ব আমরা সম্যক উপলব্ধি করতে পারি। বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় খেলাধুলা, শরীরচর্চা একটা গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করে রয়েছে । কর্ম ও শিক্ষার মধ্যে সমন্বয়সাধনের জন্য যেমন কর্মশিক্ষা গ্রহণ করা হয়েছে, তেমনি শিক্ষা ও শরীরের সমন্বয়ের জন্য নানাবিধ শারীরশিক্ষা কর্মসূচিকেও গ্রহণ করা হয়েছে । ব্যায়ামচর্চা, যোগব্যায়াম, ব্রতচারী, লাঠিখেলা, দলগত খেলা প্রভৃতি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে চালু করা হয়েছে । তবে একথা ঠিক, লেখাপড়া ত্যাগ করে শুদ্ধ খেলার কথা কেউ বলেন নি । সেখানে স্মরণীয় হল 'Play while you play, read while you read'.
উপসংহার :-
একথা বর্ণে বর্ণে সত্য যে, মানুষের বৌদ্ধিক বিকাশে যেমন শিক্ষার প্রয়োজন অনস্বীকার্য, তেমন শারীরিক সুস্থতার জন্য ক্রীড়ানুশীলনের প্রয়োজনও অপরিহার্য । অবশ্য, এর জন্য সুষম খাদ্যের যোগান শিক্ষার্থীদের পাওয়া উচিত । কথায় বলে- 'Sound body and sound mind are key to all successes.' শরীর ও মনের যুগলবন্দিতে জীবনে সাফল্যের ইমারত দাঁড়াতে পারে । তাই চরিত্র গঠনে খেলাধুলার ভূমিকা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন