প্রবন্ধ রচনা - জাতীয় সংহতি

 প্রবন্ধ রচনা - জাতীয় সংহতি

প্রবন্ধ রচনা - জাতীয় সংহতি


"জাতীয় সংহতি মিলনের সুরে 

প্রগতির কথা বলে, 

বিভেদ ভুলিয়া, হৃদয় মেলিয়া-

হাতে হাত ধরে চলে।"

       একটি জাতির উন্নতির মূল কথা হল জাতীয় সংহতি । জাতি, ধর্ম, বর্ণ, দলমতনির্বিশেষে একটি দেশের প্রত্যেকটি মানুষ যদি এক মন্ত্রে দীক্ষিত হয়, যদি একসূত্রে গ্রথিত হয় সহস্র কোটি মন, তবেই দেখা দেবে জাতীয় সংহতি । তখন বিভেদ ভুলে হৃদয় মেলে সকলে হাতে হাত ধরে চলে । রচিত হয় মহামিলনের মানব শৃঙ্খল ।

         জাতীয় সংহতি হচ্ছে জাতির অর্থাৎ দেশের জনগণের আন্তরিক ঐক্যচেতনা বা ঐক্যানুভূতি । নানা ভাষা নানা মত ও নানা পরিধানের বাধা সত্ত্বেও কোনো দেশের অধিবাসীদের মধ্যে মিলনের ও ঐক্যবোধের চেতনার বিকাশ ঘটলেই জাতীয় সংহতির বিকাশ ঘটে । কোনো জাতির সকল মানুষ যখন জাতিভেদের সীমা, ভৌগোলিক সীমা, অর্থ-সংগতির সীমা, সাম্প্রদায়িকতার সীমা, নানা বিশ্বাস ও সংস্কারের সীমাকে উপেক্ষা করে নিজেদের মধ্যে ঐক্যবোধ ও চেতনাকে জাগিয়ে তোলে, তখনই এক সূত্রে সহস্র জীবন গ্রথিত হয়ে জাতীয় সংহতির ছবি পরিষ্কার হয়ে ওঠে । শিক্ষাবিদরা জাতীয় সংহতিকে সুদৃঢ় ও সুরক্ষিত করার জন্য শিক্ষাকে প্রধান হাতিয়ার হিসেবে গ্রহণ করতে উপদেশ দেন ।

         এক্ষেত্রে মনে রাখা প্রয়োজন যে, জাতীয় সংহতির পথের বাধা সৃষ্টিকারী মূল বিষয়গুলি হল: (১) ধর্মীয় আবেগ ও সাম্প্রদায়িকতা, (২) জাতিভেদ প্রথা, অস্পৃশ্যতা ও বর্ণ-বৈষম্য, (৩) বহু ভাষা, সেই ভাষাগুলির যথাযথ মর্যাদা দরকার । -সাধারণের মধ্যে যোগাযোগ স্থাপনের জন্য কোনো একটি বিশেষ সর্বজনগ্রাহ্য ভারতীয় ভাষারও দরকার, (৪) সংকীর্ণ প্রাদেশিকতা এবং উপদলীয় কোন্দল, (৫) বহুদল প্রথার গণতন্ত্র, (৬) দেশবিভাগজনিত উদ্বাস্তু সমস্যা ও জনসংখ্যা বৃদ্ধি, (৭) অর্থনৈতিক অসাম্য, (৮) দেশের বৃহৎ সংখ্যক মানুষের নিরক্ষরতা এবং (৯) আমাদের দেশে দীর্ঘদিন ইংরেজ প্রদত্ত পুঁথিকেন্দ্রিক কেরানি তৈরির শিক্ষাব্যবস্থা । এছাড়াও হতাশাগ্রস্ত বৃহত্তর জনসমাজ, বেকারি, উদ্দেশ্যবিহীন শিক্ষা, সমাজবিরোধীদের প্রাদুর্ভাব, ক্ষমতাস্পৃহা, বিদেশি শক্তির মদত প্রভৃতি আমাদের দেশে জাতীয় সংহতি বিনষ্ট করতে বিশেষ সক্ষম ।

          এই পরিস্থিতির মোকাবিলা করে জাতীয় সংহতিকে মূর্ত করে তুলতে সর্বাগ্রেই দরকার একটি আদর্শ জাতীয় শিক্ষা পরিকল্পনা । বাস্তবায়ন এবং তার একটি উদার জাতীয় শিক্ষানীতি গ্রহণ করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তা শিক্ষার্থীদের মধ্যে সঞ্চার করলে জাতীয় সংহতি স্থাপনের পথ প্রশস্ত হতে পারে । পাঠক্রমে এমনভাবে বিষয়গুলোকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে, যাতে দেশের প্রতিটি অঞ্চলের শিক্ষার্থীর মনে উদার জাতীয় দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে ওঠে । প্রতিটি শিক্ষককে দেশপ্রেমে ও উদার জাতীয়তাবোধে উদ্বুদ্ধ হয়ে সংকীর্ণতা ও দলাদলির ঊর্ধ্বে থেকে শিক্ষার্থীর 'Friend, Philosopher and Guide' হিসেবে শিক্ষাদানের ব্যবস্থা করতে হবে ।

             দেশের অগণিত নিরক্ষর জনসাধারণের অজ্ঞতা, কুসংস্কারাচ্ছন্ন মনোভাব, ধর্মান্ধতা ও প্রাদেশিকতা হল জাতীয় সংহতির প্রধান বাধা । এগুলি দূর করতে বিদ্যালয়ের মাধ্যমে কিছু সমাজসেবামূলক কর্মসূচি গ্রহণ করে তাদের দৃষ্টিভঙ্গির সংকীর্ণতা দূর করা সম্ভব হতে পারে । এরজন্য শিক্ষার্থীদের নিয়ে শিক্ষকরা যদি সপ্তাহে কিংবা মাসে একদিন পার্শ্ববর্তী এলাকার নিরক্ষর জনসাধারণের মধ্যে সভা-সমিতি করার কর্মসূচি গ্রহণ করেন, তাদের জানা বিষয় নিয়ে সুষ্ঠু আলোচনা করেন, তাদের বক্তব্য শোনেন এবং নিরক্ষরতা অবসানের উপায় বুঝিয়ে দেন, তাহলে জাতীয় সংহতিমূলক কাজের পথ প্রশস্ত হয় । পারস্পরিক মিলনের পথকে সুদৃঢ় করে একসাথে চলার মন্ত্রে দীক্ষিত করে তোলাই প্রধান কাজ ।

           সুতরাং আপামর জনগণকে হীন-সংকীর্ণ স্বার্থ, বুদ্ধি বিসর্জন দিয়ে ব্যাপক, উদার ও সংস্কারমুক্ত মানসিকতার মাধ্যমে আন্তরিকভাবে উপলব্ধি করতে হবে, - 'সকলের তরে সকলে আমরা, প্রত্যেকে আমরা পরের তরে ।' বিবিধের মাঝে মহান মিলনের আদর্শ গ্রহণ করতে হবে এবং 'এক জাতি এক প্রাণ' মন্ত্রে দীক্ষিত হতে হবে । আমাদের ভারতবর্ষ হল বহু ভাষাভাষী, বহু ধর্মাবলম্বী এবং বহু বিচিত্র জীবনযাত্রায় অভ্যস্ত মানুষের বসবাসের দেশ । এখানে প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য যেমন অফুরন্ত, অফুরন্ত তেমনি মানুষের বৈচিত্র্য । জাতীয় সংহতির নামে ওই বৈচিত্র্যকে কখনও জোর করে সমান করা সম্ভব নয় । আমাদের উদ্দেশ্য হবে, 'Unity in diviristy'. -বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য তৈরি করাই হল আমাদের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য । সকলের বৈশিষ্ট্যকে বজায় রেখেই তৈরি করতে হবে জাতীয় সংহতি । নইলে জাতীয় সংহতি কোনো দিনই সফল হবে না । 

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

প্রকাশিত হলো UGC - NET December 2025 পরীক্ষার Answer Key

প্রবন্ধ রচনা - সাম্প্রদায়িকতা ও ছাত্রসমাজ

আপার প্রাইমারি 2026, Social Studys থেকে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্তর - ক্লাস 1